নদীতে কচুরিপানা : প্রতিমাবিসর্জন নিয়ে শঙ্কায় ভাঙ্গুড়ার হিন্দু সম্প্রদায়

প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে

প্রতিনিধি, ভাঙ্গুড়া (পাবনা) :
বৃহত্তর পাবনা(​পাবনা ও সিরাজগঞ্জ)জেলার পূর্ব-উত্তর সীমানা দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের স্রোতস্বী ও দৃষ্টিনন্দন করতোয়ার শাখা নদীটি এখন পঁচা-কচুরিপানায় সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে অধোঁপুকুরে পরিণত হয়েছে।এক সপ্তাহ আগেও নদীতে স্বচ্ছ পানির মুক্ত ধারা ছিলো গত বৃহস্পতিবার থেকে তা মৃতপ্রায় এক পচা মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থপরতা ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে বৃহত্তর পাবনার (পাবনা-সিরাজগঞ্জ)অন্তত লক্ষাধিক মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে।বর্তমান পূর্বের সেই স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত নদীর পরিবেশকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
সরেজমিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউপি’র করতকান্দি গ্রামের মছির সরকারের জামাই নূরে আলম(ঘর জামাই)নদীর ধারে জনৈক ব্যক্তি মালিকানাধীন জলাশয়(পুকুর)লিজ নেয়।পরে পুকুর পরিষ্কার করার অজুহাতে বিপুল পরিমাণ কচুরিপানা নদীতে ফেলার চক্রান্ত করেন। গত শনিবার(৩অক্টোবর)গভীর রাতে তিনি শ্রমিকদের নিয়ে পরিকল্পিত ভাবে গোপনে বিপুল পরিমাণ কচুরিপানা “করতকান্দি ব্রিজের দহে” নিচে প্রবহমান নদীর পানিতে ভাঁসিয়ে(ঠেলে)দেয়। মুহূর্তে থমকে যায় নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, দেখা দেয় এক অবর্ণনীয় পরিবেশগত বিপর্যয়।​সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আসন্ন প্রধান উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন কে কেন্দ্র করে।প্রতি বছর বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলের ভাঙ্গুড়া উপজেলার।মিছমৈথইর,করতকান্দি,সুলতানপুর, বৃদ্ধমরিচ,উল্লাপাড়া উপজেলার তেলিপাড়া,প্রতাপ বাজার ও তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ বাজার অঞ্চলের অর্ধশতাধিক পূজামণ্ডপের ঠাকুর বা প্রতিমা ভাঙ্গুড়া উপজেলার খানমরিচ ইউপি’র করতকান্দি “ব্রিজের করতোয়া নদীর দহে” নৌকায় পরিভ্রমন করে প্রতিমা বিসর্জন (ডুবানো)দিয়ে আসছিলেন। ঠিক সেই নির্দিষ্ট বিসর্জন ঘাটের স্থানটিকেই কচুরিপানায় পুরোপুরি ভরপুর করে ফেলা হয়েছে। বিসর্জনের নির্দিষ্ট স্থান এভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় চরম ক্ষোভ ও দিশেহারা অবস্থায় পড়েছেন এ অঞ্চলের সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষ জন।
​অপরদিকে প্রবাহমান নদীতে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে নদীর ধারে আশ্রিত শতাধিক যাযাবর অর্থাৎ বেদে বহরকে অন্যত্রে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। প্রতি বছর শরৎ কালে করতোয়ার করতকান্দি “ব্রিজের দহের” পাশেই নদী তীরে ৬ মাসের জন্য নোঙর করে অবস্থান করেন ঢাকা-টাঙ্গাইলসহ দুরদূরান্ত থেকে আসা বেদের বহর।
চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে বেদে বহর করোতকান্দি করতোয়ার নদীর তীরে বহর নিয়ে  এসেছিল, তখনো নদী ছিল একেবারেই স্বচ্ছ ও মুক্ত। মাত্র দুই-একদিনের মধ্যেই নদীতে এভাবে কচুরিপানা ঢুকিয়ে(ভাসিয়ে) দেওয়ায় তাদের নিত্যদিনের গোসল, পানীয় জল ও ডুব-স্নানে চরম ব্যাঘাত ঘটে। নিরুপায় ও চরম অসহায়ত্ব নিয়ে গত বৃহস্পতিবার  প্রায় এক শ’ বেদে পরিবার বাধ্য হয়ে এই নদীপাড় ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।
​স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, এই নদীর স্বচ্ছ পানির ওপর নির্ভর করে নদীপাড়ের প্রায় অর্ধলাখ মানুষ প্রতিদিনের গৃহস্থালী কাজ ও গোসল সম্পন্ন করতেন। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির স্নানের প্রধান ভরসাও ছিল এই জলধারা। কিন্তু হঠাৎ” নদী অবরুদ্ধ ঘের দেওয়ায়” অচল হয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য।চলন বিল অঞ্চলের ঐহিত্যবাহী নওগাঁর বৃহত্তম পশুর-পণ্যের হাটে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পাশেই তাড়াশের তাপস শ্রেষ্ঠ ওলি কামেল হযরত শাহ শরীফ জিন্দানি (র:)মাজারে দূরদুরান্ত থেকে ভক্তদের নৌপথে আসা চিরতরে বন্ধের মুখে পড়েছে।
​এ বিষয়ে মিছমৈথইর দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি নরেন্দ্রনাথ দাস, সাধারণ সম্পাদক ডাঃদুলাল সরকার, সুলতানপুর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুরারী , করতকান্দি পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সঞ্জয় কুমার দাস এবং বৃদ্ধ মরিচ পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি নিখিল বসাকসহ এ অঞ্চলের অর্ধশতাধিক পূজামন্ডপ কমিটির পূজারী ও ভক্তবৃন্দ  ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন— “আগামী ১-২ দিনের মধ্যে যদি প্রতিমা বিসর্জন ব্যবহৃত করতোয়া নদীর ঘাটসহ পুরো নদীর কচুরিপানা অপসারণ করা না হয়, তবে আমাদের “শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জনসহ” সার্বিক উৎসব মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। আর এর সমস্ত দায়ভার করতকাকান্দি গ্রামের মছিরের জামাই নূরে আলমকেই নিতে হবে। অন্যথায় আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করব।”
আনিত ​পরিবেশ ধ্বংসকারী নূরে আলমকে বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি কর্ণপাত না করায় ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও পূজা কমিটি পাবনা জেলা প্রশাসক, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক, ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্তের কথা জানান।
​অপর দিকে নদী দূষণের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে কিছু অসাধু মুরগি ব্যবসায়ীর অনৈতিক কর্মকান্ড। অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রতিদিন গভীর রাতে এই ব্রিজের উপর থেকে বয়লার মুরগির বর্জ্য ও নাড়িভুঁড়ি নদীর পানিতে ফেলে পানি মারাত্মকভাবে দুর্গন্ধযুক্ত ও বিষাক্ত করে তুলছে।
​এ অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহতকারী অভিযুক্ত নূরে আলমের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে ১-২দিনের মধ্যে কচুরিপানা অপসারণের দাবী জানান।