নদী পারাপারে হাজারো মানুষের ভোগান্তি, নিজ খরচে ভাসমান সেতু বানালেন বিএনপি নেতা মীর জাহিদ

প্রতিনিধি ঠাকুরগাঁও :
প্রকাশ: ১৫ ঘন্টা আগে

বর্ষা এলেই ফুলে-ফেঁপে ওঠে টাঙ্গন নদী। নদীর দুই পাড়ে বসবাসকারী কয়েকটি গ্রামের মানুষের জন্য তখন শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ সবাইকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁতরে কিংবা পানিতে নেমে নদী পার হতে হয়। অনেক সময় রোগীকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। বিকল্প হিসেবে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ ঘুরে গন্তব্যে যেতে হয়।

বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সেতু নির্মাণ হয়নি। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি মিললেও ভোট শেষে আর কেউ খোঁজ নেন না এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। শেষ পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে ব্যক্তিগত অর্থায়নে ড্রাম দিয়ে একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করেছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়ন বিএনপির নেতা ও বিশিষ্ট্য ব্যবসায়ী মীর জাহিদ হাসান।

তার এই উদ্যোগে স্বস্তি ফিরেছে আকচা ইউনিয়নের পালপাড়া এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া টাঙ্গন নদীর দুই পাড়ের কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষের জীবনে। এখন সহজেই নদী পার হয়ে স্কুল-কলেজে যেতে পারছেন শিক্ষার্থীরা। কৃষকেরা নির্বিঘ্নে জমিতে যাতায়াত করছেন। সাধারণ মানুষও বাজার, হাসপাতালসহ বিভিন্ন গন্তব্যে নিরাপদে চলাচল করতে পারছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টাঙ্গন নদীর ওপারে কয়েক শত একর কৃষিজমি রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বেড়ে গেলে ওই জমিতে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনেক কৃষক সময়মতো জমিতে যেতে না পারায় চাষাবাদ ব্যাহত হয়। আবার কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হয়ে কৃষিকাজ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মলিন বলেন, বহু বছর ধরে এই নদী পার হতে আমাদের খুব কষ্ট হতো। বর্ষাকালে ছোট ছোট শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হতো। অনেক সময় সাঁতরে পার হতে হয়েছে। এখন ড্রামের ভাসমান সেতু হওয়ায় নিরাপদে পার হতে পারছি।

আরেক বাসিন্দা ধনেশ পাল বলেন, নদীর ওপারে আমাদের অনেক কৃষিজমি রয়েছে। পানি বেশি থাকলে জমিতে যেতে পারতাম না। অনেক সময় ফসলের ক্ষতি হতো। এখন সেতু হওয়ায় সহজেই যাতায়াত করতে পারছি। বাজার, স্কুল কিংবা হাসপাতালে যেতে আর আগের মতো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে না। নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতুর দাবি বহু বছরের। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগে পড়তে হয় এলাকাবাসীকে।

শিক্ষার্থী প্রতিমা বলে, আগে স্কুলে যেতে খুব ভয় লাগত। নদী পার হওয়ার সময় সব সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকত। এখন সেতু হওয়ায় অনেক নিরাপদে স্কুল-কলেজে যেতে পারছি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে অনেক সময় ১০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। জরুরি মুহূর্তে এই অতিরিক্ত পথ অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষার্থীরা বর্ষাকালে নিয়মিত স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। কৃষকেরাও নদীর ওপারের জমিতে যেতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।

তারা বলেন, আমরা যাতে নিরাপদে নদী পার হতে পারি, কৃষিজমিতে যেতে পারি এবং ছেলে-মেয়েরা নিয়মিত লেখাপড়া করতে পারে সেই চিন্তা থেকেই জাহিদ ভাই নিজের উদ্যোগে এই ড্রামের ভাসমান সেতু নির্মাণ করেছেন। এতে আমাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট অনেকটাই কমেছে।

ভাসমান সেতুর উদ্যোক্তা মীর জাহিদ হাসান বলেন, নদী পারাপারে মানুষের দুর্ভোগের কথা জানতে পেরে আমি আর বসে থাকতে পারিনি। সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষা করলে হয়তো আরও সময় লাগত। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যক্তিগত অর্থায়নে ড্রাম, বাঁশ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে এই ভাসমান সেতু নির্মাণ করেছি। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারাটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

তিনি আরও বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। একজন এলাকার মানুষ হিসেবে নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই কাজটি করেছি। যতদিন প্রয়োজন হবে, ততদিন সেতুটি সচল রাখার চেষ্টা করব। তবে এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর করতে নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ জরুরি।