সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে রাতের আঁধারে বেকু দিয়ে মাটি কাটার অভিযোগ

প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) প্রস্তাবিত অফিস ও ডিআরএস ভবনের প্লট ভরাটকে কেন্দ্র করে অনুমোদন ছাড়া পার্শ্ববর্তী প্লট থেকে মাটি কাটার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাতের আঁধারে একাধিক বেকু (এক্সকাভেটর) নামিয়ে শিল্পপার্কের বিভিন্ন প্লট থেকে গভীর করে মাটি কেটে পিজিসিএলের নির্ধারিত প্লটে নেওয়া হয়েছে। এতে কয়েকটি প্লটে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত।
সরেজমিনে মাটি কাটার চিহ্ন
শুক্রবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, পিজিসিএলের প্রস্তাবিত অফিস ও ডিআরএস ভবনের প্লটের চারপাশে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। প্লটের ভেতরের অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এর পাশের কয়েকটি প্লটে দেখা যায় গভীর গর্ত ও মাটি কাটার স্পষ্ট চিহ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিল্পপার্কের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে রাতের বেলায় বিভিন্ন প্লট থেকে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছিল। সর্বশেষ রাতে একাধিক বেকু ব্যবহার করে পাশের প্লট থেকে মাটি কেটে পিজিসিএলের প্লট ভরাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও কোথাও প্রায় দুই মানুষ সমান গভীর করে মাটি কাটা হয়েছে। এতে প্লটগুলোর ভূমির স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্থাপনা নির্মাণ ও নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
অনুমতি দেয়নি বিসিক
বিষয়টি নিয়ে সিরাজগঞ্জ বিসিক জেলা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (জেলা প্রধান) মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন, “আমাদের অনুমতি সাপেক্ষে পাশের প্লট থেকে মাটি ভরাট করার কথা ছিল। তবে কথা ছিল শুধু মাটি কেটে ওই প্লটেই রাখা হবে এবং ওয়ালের পাশে দিয়ে দেওয়া হবে। তারা যেভাবে পাশের প্লটের মাটি কেটে গভীর গর্ত করে নিজেদের প্লট ভরাট করছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমাকে শুধু ওয়ালের কাজের কথা বলা হয়েছিল। এভাবে মাটি কাটার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।”
সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের শিল্পনগরী কর্মকর্তা ও পার্ক প্রধান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোফাজ্জল হোসেন বলেন, “আমাদের কাছ থেকে কোনো প্রকার অনুমতি নেওয়া হয়নি। বেকু লাগিয়ে পাশের প্লটের মাটি কাটা সম্পূর্ণ বেআইনি। এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তাহলে রাতের আঁধারে বেকু ঢুকল কীভাবে?
বিসিকের দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে পার্শ্ববর্তী প্লট থেকে বেকু দিয়ে গভীর করে মাটি কাটার কোনো অনুমোদন না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বিসিকের অনুমতি না থাকলে রাতের আঁধারে ভারী যন্ত্রপাতি শিল্পপার্কে প্রবেশ করল কীভাবে? কার নির্দেশে মাটি কাটা হলো? কত পরিমাণ মাটি নেওয়া হয়েছে? ক্ষতিগ্রস্ত প্লটগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কার?
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, শিল্পপার্কের বিভিন্ন প্লট থেকে মাটি কাটার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম চলছে। তাদের দাবি, বিসিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে রাতের বেলায় মাটি কাটার ঘটনা তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
৭১৯ কোটি টাকার প্রকল্পে নতুন প্রশ্ন
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া, বেলুটিয়া, মোরগ্রাম ও ছোট পিয়ার এলাকায় প্রায় ৪০০ একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক। কয়েক দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর পর প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭১৯ কোটি ২১ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৭৫ একর জমিতে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘এস’ ক্যাটাগরিতে মোট ৮২৯টি শিল্প প্লট তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫০টি বিদেশি এবং ২৭৯টি দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ধারিত।
২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত দেখানো হলেও শিল্পপার্কে গ্যাস, পানি ও স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যেই সরকারি গ্যাস কোম্পানি পিজিসিএলের প্রস্তাবিত স্থাপনার প্লট ভরাটে পার্শ্ববর্তী প্লট থেকে অনুমোদন ছাড়া মাটি কাটার অভিযোগ নতুন করে শিল্পপার্কের ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নির্ধারণ করা হোক। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত প্লটগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া, কত পরিমাণ মাটি কাটা হয়েছে তা নিরূপণ এবং মাটি কাটার বিষয়ে কোনো লিখিত অনুমতি থাকলে তা জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।