
প্রতিনিধি, ভাঙ্গুড়া (পাবনা) :
পাবনার ভাঙ্গুড়া পৌর সদরের শরৎনগর বাজারে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি হাসপাতালে সন্তান জন্মের পর দু’নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ডাক্তার ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ বিরুদ্ধে করেছেন, নিহত নবজাতকের স্বজনরা।তাঁদের দাবি, জন্মের পর পরই সময়মতো চিকিৎসা সেবা না পাওয়া এবং সিজারিয়ান অপারেশন বিলম্বের কারণে সন্তানদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
গত শনিবার পৌর শহরের শরৎনগর বাজারে অবস্থিত “ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড হাসপাতালে ঘটনা দু’টি ঘটেছে বলে পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন।এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায় অস্বীকার করেছেন,প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক(প্রশাসন) মো.আব্দুল জব্বার।দুটি পরিবারের জন্যই দিনটি ছিল নতুন অতিথিকে বরণ করে নেওয়ার। কিন্তু সন্তান জন্মের পরপরই সেই আনন্দ রূপ নেয় গভীর শোকে। নবজাতকদের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রসবকালীন সংকটের সময় যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়নি। এ ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের মাসুদ রানা (৪০) ও তাঁর স্ত্রী অন্তরা খাতুনের (২৫) ক্ষেত্রে। প্রায় দুই বছর আগে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়।প্রায় দশ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অন্তরা খাতুন শনিবার (১০অক্টোবর)ভোরে প্রসবব্যথা শুরু হলে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তাঁকে শহরের শরৎনগর বাজারস্থ নাজিম উদ্দিন মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হয়।পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে আলট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক মা ও গর্ভের সন্তান সুস্থ আছেন বলে জানান।হাসপাতাটিতে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য চিকিৎসক না থাকায় প্রসূতি মাতাকে অন্যত্রে চিকিৎসা জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়।
একই দিনে সকাল ১০টার দিকে প্রসূতি মাতা অন্তরাকে শরৎনগর বাজারের ” ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে পৌঁছে সিজারিয়ান অপারেশনের কথা বললে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, চিকিৎসক বাইরে আছেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই চলে আসবেন। ততক্ষণ স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করতে বলা হয়।এক পর্যায়ে প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর নার্সের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসব করানো হয় বলে, নবজাতকের পরিবারের দাবি।
সন্তান জন্মের পর নবজাতকের কোনো সাড়া না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে শিশুটিকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে তাঁরা ” ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে” নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক উম্মে হুরাইরা নবজাতককে মৃত ঘোষণা করেন।
সন্তান হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন অন্তরা খাতুন। তাঁর অভিযোগ, সময়মতো চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় সন্তানকে হারাতে হয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।শিশুটির চাচা কামাল হোসেনও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, প্রসবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চিকিৎসক না পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।এ বিষয়ে চিকিৎসক উম্মে হুরাইরা নবজাতকটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে তাঁর কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।একই দিনে উপজেলার চৌবাড়িয়া দক্ষিণপাড়ার তারেক আলীর স্ত্রী মুসলিমা আক্তার মনাকেও “ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড হাসপাতালে” ভর্তি করা হয়। পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্রসবব্যথা নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্বজনদের মতে, ভর্তির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর শরীরে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানালে তাঁরা দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করেন। এরপরও সিজারিয়ান অপারেশনের চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায় অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ তাঁদের। চিকিৎসক কিছুক্ষণের মধ্যে আসবেন এমন আশ্বাসে প্রায় তিন ঘণ্টা পার হয়ে যায় বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
পরে চিকিৎসক এসে অস্ত্রোপচার করেন। কিন্তু নবজাতকের অবস্থা ভালো না থাকায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাবনা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পথে শিশুটির মৃত্যু হয় বলে জানান স্বজনরা।
দ্বিতীয় শিশুটির পরিবারের সদস্যরাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, প্রসবের সময় যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে নবজাতককে বাঁচানোর সুযোগ তৈরি হতে পারত। নিহত নবজাতকের চাচা মাসুদ রানা ও এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেন
এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া হেলথ কেয়ার লিমিটেড হাসপাতালের পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার(প্রশাসন) তাঁদের প্রতিষ্ঠানের দায় অস্বীকার করে বলেন, তার হসপিটালে নিয়ম অনুযায়ী নরমাল ডেলিভারি এবং সিজারিয়ান অপারেশন করানো হয়েছিল।ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: হালিমা খানম বলেন, রোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাবনা সিভিল সার্জন মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিষয়টা সম্পর্কে আমি অবগত নই। আপনার কাছ থেকেই প্রথম জানতে পারলাম। হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পূর্ণ তদন্তের মাধ্যমে পরবর্তীব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
